এক ভয়ংকর সত্যের কবলে #এম_ওয়াসিক_আলি
সংসার এক ইমারত, সে ইমারতের মূল স্তম্ভ স্বামী-স্ত্রী। সে সংসারের বৈচিত্র সব থেকে আলাদা এবং সব সময় কিছু না কিছু চলতেই থাকে । কেউ-কেউ বলে রোজ রোজ ঘ্যানর ঘ্যানর আর ভালো লাগে না। একটু শান্তিতে থাকতে দাও না প্লিজ!! আবার অনেকেই একনিষ্ঠ আজ্ঞাকারী। স্বামী-স্ত্রীর দৈনন্দিন খুট-খাট, খুঁনসুটি আর ভালমন্দ নিয়েই সংসারের তরী গন্তব্যে এগিয়ে চলে ।
মাঝে মাঝেই হেঁসেলে কারি-পাতার খোঁজ পড়ে। হাবে-ভাবে মানা করার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু ইশারা-ইঙ্গিতে বলা কথাগুলো হেঁসেলের অধিকর্তা শুনবেই বা কেন?
যাই হোক,বেশকিছু দিন গড়িমসি করার পর একদিন নিরুপায় হয়ে সকাল ৫ টায় বেড়িয়ে পড়লাম কারি-পাতার খোঁজে। বিদেশ ভূঁইয়ে, পাহাড়ি এলাকায় কারি-পাতার খোঁজ পাওয়া সাধ্যকর নয়। তবুও একবার চেষ্টা করে দেখলে ক্ষতি কি?
সূর্য-মামার ঘুম তখনও ঠিকমত ভাঙেনি,হয়তো বিছানায় ছটপট করছে, এক কাপ চায়ের জন্যে।অল্প অল্প আলোয় সকালটাকে বেশ প্রাণবন্ত লাগছিল। হোক না কারি-পাতার আবদার, বৌকে মনে মনে ধন্যবাদ না জানিয়ে উপায় ছিল না, তার জন্যই প্রাণবন্ত সকালটাকে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি।
উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা, পায়ে হেঁটে, কিছুদূর চলার পর এক সত্তর ছুঁইছুঁই বৃদ্ধার সাথে দেখা, নমস্কার-প্রতি নমস্কারের পর কারি-পাতা গাছের সন্ধান করলাম, বেচারি অনেক কিছুই মনে করার চেষ্টা করলেন এবং কিছু পরে ফোকলা হেসে বলল বাবা এ রকম গাছের নাম সে কখনোই শুনে নি। বেচারির হাবভাব দেখে খুব মজা পাচ্ছিলাম।
ক্ষুণ্ণ মনে এগোচ্ছি, একটা কালো রঙের পাহাড়ি কুকুর ধাওয়া করল, প্রাণপণে ছুট দিলাম, এক যুবক আমাকে দেখি হাসছিল, অদ্ভুত এক শিশ দিতেই কুকুরটি শান্ত হয়ে মনিবের পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করতে লাগল। যাক এ যাত্রা বাঁচা গেছে, নইলে ১৪ টা ইনজেকশন পাক্কা ছিল। কপালের জোরে বেঁছে গেছি! এখন ভাবলে গা শিউরে ওঠে।
যুবক বলল " আপনি কি নতুন?"
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। প্রাথমিক আলাপ আলোচনার পরে আসল কথাটি পাড়লাম।
মনে হল সেও কিছুই জানে না, বলল সাথে আসতে, কিছুদূর চলার পর দূরে দেখি একটা চায়ের দোকান, কিছু লোক চা খাচ্ছে ও নিজেদের মধ্যে হাসি-মজাকে মশগুল। যুবক তাদের কাছে গিয়ে আমার বিষয়ে আলোচনা করছে বুঝলাম। কুমায়নি ভাষায় কথা বলছিল, বিষয়বস্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার পর সকলে মিলে আমার দিকে এগিয়ে এলো, মনে মনে ভাবলাম কাজ হাসিল হয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই একের পর এক প্রশ্ন ধেয়ে আসতে শুরু হয়েছে,
কোথায় বাড়ি?
এখানে কোথায় থাকেন?
কি করেন?
এই পাতা কেন খুঁজছেন?
কি কাজে লাগে?
কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা? ইত্যাদি ইত্যাদি---
কোথায় বাড়ি?
এখানে কোথায় থাকেন?
কি করেন?
এই পাতা কেন খুঁজছেন?
কি কাজে লাগে?
কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা? ইত্যাদি ইত্যাদি---
বেশ ভয়ে ভয়ে সবগুলো প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিলাম। মনে হল উত্তরে সকলে সন্তুষ্ট নন। রীতিমতো ভিড় জমে গেছে। অনেক কৌতূহল চোখ উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। কি ফ্যাসাদে পড়লাম রে বাবা!! শেষে আবার উত্তম-মধ্যম খেতে না হয়।
এক বিশাল গোঁফ-ওয়ালা লোক বেশ কিছুক্ষণ ধরে দূর থেকে কাণ্ডকারখানা দেখে মজা পাচ্ছিল ও মিটি হাসছিল, ভিড় একটু পাতলা হতেই আমার দিকে এগিয়ে এলো এবং স্মৃত হেসে বলল - কারি পাতা চাই? মাথা নেড়ে হাঁ বললাম।
লোকটি বলল - আমি এক্স-আর্মি ম্যান, আপনাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলে প্রায় ৩ বছর ছিলাম।মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের জানকারী আছে, এক্স-আর্মির লোক, সারা ভারতের বিভিন্ন ঘাটের জল খাওয়ার অভ্যাস আছে।
সে বলল – এখান থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে পিথোরাগড় এর আশেপাশে পাওয়া যায়। আসলে উত্তরাখণ্ড দেবভূমি, আর এখানকার লোকজন খুব সহজ সরল, এরা এই সব গাছের উপকারিতা সম্পর্কে ঠিক ভাবে জানে না, তাই আপনাকে সন্দেহের চোখে দেখছিল। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। লোকটির কথাবার্তায় বেশ খুশি হলাম।আপনি চিন্তা করবেন না কাল আসুন পেয়ে যাবেন, ভদ্রলোক নিজের ফোন নাম্বারটিও দিলেন।
মনে মনে খুব খুশি হয়ে বাসার দিকে এগিয়ে গেলাম, মনে হচ্ছে যেন স্বর্গ জয় করে ফিরছি।
বাসায় ফিরে কোনও টু-টা করলাম না। অন্য এক সাধারণ দিনের মতোই সকালটা কাটল, বৌকে সারপ্রাইজ দেব, ভেতরে ভেতরে মন খুব টগবগ টগবগ করছিল।
সারাটি-দিন যে কিভাবে কেটে গেল বুঝতেও পারলাম না। রাতেও একই অবস্থা, সারারাত প্রায় জেগেই কাটল, পাশের মন্দিরে ঘণ্টা বেজে উঠার সাথে সাথে বেরিয়ে পড়লাম। যথাস্থানে পৌঁছে ফোন করলাম, ভদ্রলোক কিছু পরে এলেন, খুশিতে তর সয়ছিল না। আসার পর কাউকে ফোনে যোগাযোগ করলেন এবং কিছু পরে বিনম্রতার সাথে জানালেন একটু অপেক্ষা করতে হবে।
প্রায় ১০ মিনিটের অপেক্ষা, মনে হচ্ছে যেন দশ যুগ ধরে অপেক্ষায় আছি।
কিছু পরে একটি গাড়ি এসে দাঁড়াল, গাড়ির চালক এক প্যাকেট আমার হাতে তুলে দিল, নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পাচ্ছিলাম না, এক ব্যাগ ভর্তি কারি-পাতা আমার হাতে!!
স্যার কিছু বকশিশ? হা-হা করে ১০০ টাকার একটি নোট বাড়ালাম, মনে হচ্ছে সে খুশি নয়, শেষে ৫০০ টাকায় রফা দফা হল। সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁটা শুরু করলাম।
কিছুদূর এগোনোর পরে পেছনে ফিরে দেখি আর্মি-ম্যান ও ড্রাইভারের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি হচ্ছে। মনে মনে হাসলাম। এই যুগে, এটাই বাস্তব।
পথিমধ্যে সেই বৃদ্ধার সাথে দেখা, তার হাতেও জোর করে ৫০ টাকা ধরালাম, নিজেকে কুবের কুবের মনে হচ্ছিল।
বাসায় ফিরেই সগর্বে ব্যাগটি স্ত্রীর হাতে তুলে দিলাম, সে বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হল না।
আমি বললাম , তোমার চাই না ?
শান্ত সুরে বলল, - এত পাতা কেন নিয়ে এলে? কালকেই তো ঝুমা বউদি একগাদা কারি-পাতা দিয়ে গেছে। কোথায় রাখবো এত পাতা, সব নষ্ট হয়ে যাবে!
মুহূর্তের মধ্যে মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল, সামনে সব কিছু অন্ধকার মনে হল।আবিষ্কার করলাম আমার হাত-পা গুলো কেমন যেন কাঁপতে শুরু করেছে। মনে হছে যেন এখুনি হার্ট অ্যাটাক আসবে। নিজেকে সামলে নিলাম।
এত কষ্টের মাঝেও হাসি পেল।
আর টাকার কথা নাই বা বললাম!!
