সম্পর্কের সমীকরণ

এডমিন
0

ছোট গল্প  - সম্পর্কের সমীকরণ

আজ বেশ তাড়াতাড়ি খুম ভেঙে গেল অনীশের।মাত্র ৬ টা ৪০ বাজে, এমনিতে ৮টার আগে কখনোও তার ঘুম ভাঙে না। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনী, তারপরে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন 1 ঘণ্টা করে যুদ্ধের পর শরীর অবশ হয়ে আসে, কোনও বল থাকে না। অফিসে সামান্য ক্লার্কের চাকরি।
কিন্তু সব দিনই এরকম ছিল না, বেশ সচ্ছল বনেদী ঘরের সন্তান, দুই ভাইবোনের মধ্যে বড়। ছোট বেলায় মাত্র 12 বছরে জীবনে প্রথম বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়। 2 বছর যাবৎ ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেন। মায়ের চিকিৎসার পেছনে সর্বস্বান্ত বাবা কেমন যেন হয়ে গেলেন, ছন্নছাড়া, উদাসীন, খাওয়া দাওয়া ছেড়ে সবসময় আনমনে আকাশের দিকে নির্লিপ্ত চেয়ে থাকতেন। অনীশের খুব কষ্ট হতো।
সেই বাল্যকালেই জীবনে আরও এক নির্মম অভিজ্ঞার সম্মুখীন হতে হল, ঠিক সাত মাসের মাথায় বাবাকে হারিয়ে অকূলপাথারে পড়ল। কিছুদিন নিকটস্থ আত্মীয়স্বজনেরা ভরসা দিলেও, কিছুদিন পরে সব কিছুই শূন্য। ছোট্ট একরত্তি বোন সেও মাত্র 4 বছরের, কিছুই জানে না বা বোঝে না।
জীবন মানুষকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দেয়। যে কিছু সামান্য সম্পত্তি বেঁচে ছিল বিক্রিবাটা করে ছোট্ট একটি মনোহারির দোকান দিয়ে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করতে লাগলো। ছোট্ট বোনকে বুকে আগলে রেখে প্রতিকূলতার সাথে নিত্যদিন যুদ্ধ করে সব কিছুই ভুলে এগোতে থাকলো।
ছোট্ট ব্যবসা হলেও খাওয়া-পরার জন্য কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। কঠোর পরিশ্রম করে বোনকে স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা করল। নিজেও অল্প বিস্তর পড়াশুনা করে টেনেটুনে বিএ পাশ করল। ঋণে জর্জরিত, পাওনাদারদের গঞ্জনা চরমে উঠলে, সাধের দোকান বিক্রি করে ঋণমুক্ত হল। তারপর থেকেই বেসরকারি ফার্মে সামান্য মাস মাইনের চাকুরী।
বোনের বিয়ে ভাগ্যক্রমে খুব ভালো ব্যবসায়ী পাত্রের সাথে সম্পন্ন হয়, সে আজ সুখী। অনীশও নিজে বিয়ে থা করে সংসারী। জীবনের রেলগাড়ি কোনরকমে ধুকধুক করে চলছে।
গতকাল অফিস থেকে ফেরার পথে মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করছিল, "সামনে প্রথম জামাইষষ্ঠী, ইচ্ছে বোন জামাইকে অন্তত: একবার খুব আদর করে খাওয়ানোর"। কিন্তু নুন কিনতে পান্তা ফুরোয়। অনেক কষ্টে কথাগুলো অনিতাকে বলেছিল, তার পর থেকেই বউ কেমন যেন গুম হয়ে গুটিয়ে গেল। কথাবার্তা রাত থেকেই বন্ধ। অনীশের বুকের মাঝে এক বিশাল ঝড় বয়ে যায়। আদরের বোন, মা বাপের স্মৃতি বলে কিছু থাকলে সে শুধু অনীশকে ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ঘুমোতে গেল, সারাটি রাত ঘুমের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অবশেষে উঠে পড়ল। মাথাটা খুব ঝিমঝিম করছে, কিছু করার নেই, অফিসে সময়মত পৌঁছতেই হবে নইলে আরও কষ্ট কপালে আছে।
বেরোনোর সময় অনিতা হেসে বলল - ঠিক আছে তাদের ডেকে নাও। অপ্রত্যাশিত ভাবে মুহূর্তে অনীশের মন ভালো হয়ে গেল। অবশই ছোট্ট একটি নিবেদন সহ "দেখো বেশি খরচাপাতি যেন না করে ফেলো"। হোক না ছোট্ট নিবেদন। আনিতাকে জড়িয়ে ধরে কপালে আলতো চুমু দিয়ে চলে গেল বেরিয়ে গেল।
প্রথম বার বোন-জামাই আসবে, ভালো কিছু উপহার দিতে হবে। কিন্তু সারাটা দিন মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে লাগলো, অবশেষে সন্ধ্যা বেলায় বাজার থেকে সস্তা মানানসই ছোট্ট একটি উপহার কিনে ফেললো। জামাইষষ্ঠীর দিন যথাসাধ্য স্বল্প আয়োজনে যথাসম্ভব চেষ্টা করল, যাতে আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি না থেকে যায়। বিদায় বেলায় বহুকষ্টে উপহার খানি বোনের হাতে তুলে ধরা সময় আর চোখের জল রোধ করতে পারলো না।
যথারীতি, জীবনের কাঁটা সমান্তরালে চলতে লাগলো। একদিন সপ্তাহান্তে অফিস থেকে ফেরার পর দরজায় কড়া নাড়ার সাথে সাথেই বৌ হাস্য মুখে অভ্যর্থনা করল, অনীশকে ব্যাপারটা কেমন যেন ঠেকল, কিন্তু মুখে কোনও কথা বললো না।
রাতে খাবার সময় হাসিমুখে বলল "শুনছো আমার দাদা ও বৌদি সামনের সপ্তাহে আসছে, খুশিতে আমার মন পাগল"। তুমি তো জানো আমার দাদা বহুকষ্টে ডাক্তারির পড়াশুনা করে আজ প্রতিষ্ঠিত, বৌদিও ডাক্তারের মেয়ে, দেখো যেন আমার সম্মানহানি না হয়। আমাদের বাড়িঘরের যা অবস্থা কোথায় যে বসায় ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছি না। সোফা সেট টা দেখো কত পুরনো, চারিদিকে ছিঁড়েফেটে গেছে।
প্লিজ একটা নতুন সোফা সেট কিনে দাও না, আমার সম্মান তোমার হাতে।
অনীশ ফ্যালফ্যাল করে বউয়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। বাক্যহীন, বিবশ, শুধু ভাবতে লাগলো সত্যি সত্যিই জীবন বড়োই অদ্ভুত। কিভাবে অতি সহজেই জীবনের সব সমীকরণ বদলে যায়।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

এই ওয়েবপেজটির অভিজ্ঞতা উন্নত করতে এই ওয়েবসাইট কুকি ব্যবহার করে। বিস্তারিত
Accept !