হার্ট অ্যাটাক
হঠাৎই বাজ পড়ল! বেশ কিছুটা ভীতবিহ্বল হলাম! ঠিক তখনই তিনি জড়িয়ে ধরেছিলেন সজোরে, চোখে মুখে রীতিমতো ভীতি, প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তার পুরো শরীরটা লেপ্টে ছিল আমার সাথে। অবাক হলাম, এসি কেবিন, এসি কার ছেড়ে কোন দুঃখে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। ইনি খুবই পরিচত, আমার প্রাক্তন অফিসের দন্ডপ্রতাপ বস গোপীনাথবাবু।তাঁর ভয়ে অফিসে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়, সকলেই ত্রস্ত, পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। একটা বিশেষ গুণের অধিকারী তিনি, কথায় কথায় অর্ধস্তন কর্মচারীদের চাকুরী থেকে বরখাস্ত করতে সিদ্ধহস্ত। কিছুক্ষণ আগেই আমার চাকুরীতে ইনিই লাল দাগ টেনে দিয়েছেন। এখন বাজ পড়ার ভয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরেছেন। খুব হাসি পেল, ইচ্ছে করলেও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারলাম না।
মিনিট দশেক পর সবকিছুই চুপচাপ। ঘুপচি ঘরে আশ্রয় নেওয়া বাকিদের মতো আমিও বেরিয়ে গেলাম, কিছুদূর যাওয়ার পর থমকে দাড়ালাম, ইস ঘুপচি ঘরের মালিককে ধন্যবাদ জানাতে ভুলেই গেছি। তৎক্ষণাৎ ফিরে গিয়ে দেখি, মালিক বিড়ি ধরিয়ে সুখটান দিচ্ছেন। বাবু কিছু বলবে নাকি? তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হো হো করে হেঁসে উঠল। কিন্তু আমি আমার কর্তব্য পালনে কেনো পিছুপা হবো, উনিই আজ আমাদের সকলের ত্রাতা।
বাবুবাগান লেন পেরিয়ে, একটা শর্টকাট রাস্তা আছে, রাস্তাটা আমাকে বড়োই অদ্ভুত লাগে, দু চার জন লোক থাকলেও গা ছিম ছিম করে, আজ একা একা হাঁটতে হাঁটতে ভূতের কথা ভাবছি, থাকলে থাকতেও পারে। গলিটার একটা নামও আছে- "চোর গলি", এখানে একসময় খুব চুরি ছিনতাই হতো, একজন খুনও হয়েছিল এখানে। তার আত্বা ঘুরে বেড়ায় কিনা না হলফ করে বলতে পারবো না। গলিটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলাম। শুনশান গলিতে রাতের অন্ধকারে কেউ নাম ধরে ডাকে, খুব ভয় পেয়ে ছুটে পালানোর চেষ্টা করতেই পুনঃ ডাক, খুব চেনা স্বর, ফিরে দেখি, গোপীনাথ বাবু, আমার সদ্য এক্স বস, গোপীনাথ অ্যান্ড সন্সের কর্ণধার।
জানতে চাইলাম কিছু বলবেন নাকি? বিড়বিড় করে কিছু বলতে চাইলেন কিন্তু বলার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বেশ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম, কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘাবড়ে গেলাম, অন্য এক পথিক দেব দ্যুতের মত এগিয়ে এলেন এবং তার সাহায্যে চ্যাংদোলা করে কোনো রকমে টোটোতে তুলে হসপিটালে নিয়ে গেলাম। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। গোপীনাথ বাবু সন্মানীয় ধনী ব্যক্তি, শহরে পরিচিতির গণ্ডিও যথেষ্ট, সে সূত্রেই এক পূর্বপরিচিত এক ডাক্তারের তৎক্ষণাৎ পরিচর্চার প্রাণে বেঁচে গেলেন, বাড়িতে ফোন গেল, কোনও এক পথচারীর বদন্যতায় নাকি তিনি এ যাত্রায় বেঁচে গেছেন, নিশ্চিত মহান ব্যক্তিটির খোঁজ পড়বে খুব শীঘ্রই। বাড়ির লোকজন আসার আগেই গা ঢাকা দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।
আমার দাতব্য বাসস্থানটি এক পুরানো পরিত্যক্ত বাড়ি! গেটখুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে, দোতালার সিড়ি বেয়ে উঠেতে গিয়ে কান্নার শব্দ পেলাম। মনটা বড্ড বিষণ্ণ হয়ে ওঠে ৷ তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দোতালায় উঠে ডানদিকে ছ’কদম হেটে দরজা খুলে ঢুকতেই দেখি সে কাঁদছে। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে, শ্লমা জড়ানো গলায় বললাম, কাঁদছিস কেন? ওপাশ থেকে কোন উত্তর আসে না! সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললাম, কি হয়েছে বলবি? নাকি আমি চলে যাবো?
ওপাশ থেকে নারীকন্ঠে জবাব আসে, তুই কি জানিস বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে? আমাকে নিয়ে চল। এটা জন্য একমাত্র তুই দায়ী!!
আমার জন্য? সত্যিই তো!।শুকনো হেসে বললাম চল। পুনরায় সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললাম, বাবাকে ভীষণ ভালোবাসিস তাই না?
তোর কিন্তু এভাবে, বাড়ী ছেড়ে আসা ঠিক হয়নি, ইচ্ছে করলেও বলতে পারলাম না।
ওঠ, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চল।বলতে খুব ইচ্ছে করছিল - তোকে ভীষণ ভালোবাসি, পাগলের মতো। সে জন্যই, তোর বাবা আজ অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন। হিংস্র পশুর মত ছিঁড়ে খাবে মনে হচ্ছিল।জিভ আটকে যায়! সিগারেটে আরও একটা লম্বা টান মেরে ফিসফিস করে বললাম, চিন্তা করিস না, ভালো আছেন!!!
আজ ভীষণ কষ্টের দিন। আজ বিসর্জনের দিন! কোহিনূরের মতো মূল্যবান হৃদয়ের টুকরোকে নিজ হাতে তুলে দিয়ে এলাম গোপীনাথ বাবুর হাতে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একপলকে চেয়েছিল সে। তার ঝলসানো মুখখানা অনেকদিনের চেনা।তাকে আজ ভীষণ অচেনা লাগছিল। আনমনে বিগত কয়েকটা দিনের স্মৃতিমন্থন করতে করতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আটকানোর চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি কেউই, গোপীনাথ বাবুও না, ভালোবেসে সকলের মন জয় করতে চেয়েছিলাম, প্রতিদানের ফলস্বরূপ ফিরে পেতে চাইনি। অসাড় পা দু-খানির বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করে ......বুকে দীর্ঘশ্বাস চেপে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এলাম।
